তেল কোথা থেকে আসে?

মানব সভ্যতাকে বৈপ্লবিকভাবে বিকশিত করতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে জ্বালানি সম্পদ খনিজ তেল বা পেট্রোলিয়াম। কিন্তু অনেকের মনেই কৌতুহল সৃষ্টি করে যে, ভূগর্ভের এই তেল কোথা থেকে আসে?

পেট্রোলিয়াম ছাড়া মানব সভ্যতা এক ধাক্কায় শত বছর পিছিয়ে যাবে। পৃথিবীব্যাপী এটি একটি অত্যাবশ্যক ব্যবহার্য উপাদান। বহুকাল আগে থেকেই তেল নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়েছে বিশ্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম বড় কারণও ছিল এই তেল। বর্তমান পৃথিবীতে প্রতিদিন প্রায় ৮ কোটি ব্যারেলেরও বেশি তেল উত্তোলন করা হয়। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই তেল কোথা থেকে আসে, কিভাবে তৈরি হয়েছে, ভূগর্ভে পেট্রোলিয়াম এর পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবেন এই লেখা থেকে।

খনিজ তেল বা পেট্রোলিয়াম

বর্তমান বিশ্বের মূল চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি তেল, যা পেট্রোলিয়াম নামে সর্বাধিক পরিচিত। পেট্রোলিয়াম শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ পেত্রা এবং ওলিয়াম থেকে। যার অর্থ- পাথর বা মাটি খুঁড়ে উত্তোলন করা তেল। পেট্রোলিয়ামকে আমরা পরিশোধনের মাধ্যমে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করে নানাভাবে ব্যবহার করতে পারি। অপরিশোধিত থকথকে এই কালো তেল ‘Black Gold বা কালো সোনা’ নামেও পরিচিত।

তেল কোথা থেকে আসে- পেট্রোলিয়াম মূলত হাইড্রোকার্বনের একটি মিশ্রণ। এই হাইড্রোকার্বন যৌগের আণবিক গঠনে প্রধানত কার্বন এবং হাইড্রোজেন থাকে। কোটি কোটি বছর ধরে রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এক পর্যায়ে হাইড্রোকার্বন এর যৌগটি তেলে রূপান্তরিত হয়। ভূগর্ভের অভেদ্য স্তরে এই পেট্রোলিয়াম জমে থাকে এবং সেখান থেকে উত্তোলন করে পৃথিবীব্যাপী তা ব্যবহার করা হয়।

বহুকাল পূর্ব থেকে মানব সভ্যতার উন্নয়নের জ্বালানির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে মানুষ জ্বালানি হিসেবে প্রধানত তিমি মাছের তেল ব্যবহার করতো। এর ফলে ১৮০০/১৯০০ সালের দিকে সমুদ্রে দাপিয়ে বেড়ানো তিমি মাছ, ২০ শতকের শেষের দিকে এসে প্রায় বিলুপ্ত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৩০ এর দশকে প্রতিবছর প্রায় ৫০ হাজার তিমি মাছ মেরে ফেলা হতো তেল সংগ্রহের জন্য। কিন্তু পৃথিবীর ভারসাম্যকে রক্ষা করতে অবশেষে সন্ধান মিলে পেট্রোলিয়াম/খনিজ তেলের। 

মূলত হাজার হাজার বছর আগে থেকেই পৃথিবীর মানুষ খনিজ তেল ব্যবহার করতো। মিসর ও চীনে সে সময় তেলের ব্যবহার হতো চিকিৎসার কাজে। তবে প্রাথমিকভাবে মাটি উপচে উঠতো তেল। আধুনিক যন্ত্রের অভাব থাকায় সেই উপচে ওঠা তেল ব্যবহারে সীমাবদ্ধ থাকতো সকলে। পরবর্তীতে, চীনে সর্বপ্রথম মাটি ছিদ্র করে পাইপের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ থেকে তেল সংগ্রহ করা হয়।

কিন্তু কারিগরি শিক্ষা এবং উপযুক্ত যন্ত্রের অভাবে ভূগর্ভের খুব বেশি নিচে যাওয়া যায়নি। সর্বপ্রথম ১৮৪৬ সালে আধুনিক ড্রিলিং যন্ত্রের সাহায্যে কারিগরি ভাবে তেল উত্তোলন করেন ফায়দোর সিমিয়োনত নামের এক প্রযুক্তিবিদ। এটি ছিল জ্বালানি তেল পেট্রোলিয়ামের যুগান্তরকারী উদ্ভাবন। তখন থেকেই মানবসভ্যতার উন্নয়নে বিভিন্ন কাজে পেট্রোলিয়ামের ব্যবহার শুরু হয়।

তেলের ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আরও পড়তে পারেনঃ খনিজ তেল

ডাইনোসরের থেকে তেল উৎপাদন নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা 

পৃথিবীব্যাপী বহু মানুষের মাঝে একটি ধারণা রয়েছে যে, বর্তমানে ভূগর্ভস্থ অপরিশোধিত তেল মজুদের প্রায় ৭০% মেসোজোয়িক যুগে গঠিত হয়েছিল। মেসোজোয়িক যুগ ছিল প্রায় ২৫ কোটি ২০ লাখ বছর থেকে ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে। মেসোজোয়িক যুগটি পর্যায়ক্রমিকভাবে ট্রায়াসিক, জুরাসিক এবং ক্রিটেসিয়াস যুগে বিভক্ত। সেই সময়কালটি সরীসৃপের যুগ হিসাবেও পরিচিত। কারণ, সেই যুগেই ডাইনোসর এবং অন্যান্য বৃহদাকৃতির ও ক্ষুদ্রাকৃতির সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করেছিল। এই পৌরাণিক ধারণার জন্ম কীভাবে হয়েছিল তা নিশ্চিত ভাবে জানা যায়নি।

Oslo University -এর ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক রিডার মুলার বলেন- “অনেকেরই ধারণা যে, ডাইনোসর থেকে তেল আসে। কিন্তু তেল মূলত আসে কোটি কোটি ক্ষুদ্র শৈবাল এবং প্ল্যাঙ্কটন থেকে।”

এই ধারণা সম্পর্কে ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অফ মেক্সিকো -এর ভূতত্ত্ব অনুষদের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ‘দারিও সোলানো’ এবং ‘ইজা ক্যানালেস’ বলেছেন- “এটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলেও, ধারণাটি ভুল। হাইড্রোকার্বন তৈরি করে এমন অনেক শিলা জুরাসিক স্তরে পাওয়া গেছে। আর সেই জুরাসিক যুগ হলো ডাইনোসরের ভূতাত্ত্বিক সময়কাল। সম্ভবত এই কারণেই ডাইনোসর থেকে তেল আসার ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত হয়েছে।”

আশাকরি, তেল কোথা থেকে আসে- সে সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারনাটি বুঝতে পেরেছেন।

তেল কোথা থেকে আসে বা কিভাবে তেল গঠিত হয়?

পৃথিবীতে পেট্রোলিয়াম বা তেলের উৎপত্তির পেছনে প্রধান উৎস কোন বড় সরীসৃপ নয়। বরং কোটি কোটি ক্ষুদ্র শৈবাল এবং প্ল্যাঙ্কটন এবং অন্যান্য অনুজীবীরাই এর প্রধান উৎপত্তিস্থল। গবেষকদের প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী তেলের উচ্চ সম্পর্কের সর্বাধিক স্বীকৃত তত্ত্ব হলো, এটি সমুদ্র এবং জলাশয় গুলোর তলদেশে জমে থাকা প্রাণী এবং অতি সূক্ষ্ম শৈবাল পচে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়েছে। 

তেল কোথা থেকে আসে তা নিয়ে- ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অফ মেক্সিকো -এর বিজ্ঞানীরা তেলের উৎপত্তি সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেন যে, সূক্ষ্ম পলিদানাসহ বিভিন্ন জৈব পদার্থ, যেমন- স্থলজ বা সামুদ্রিক উদ্ভিদ নদী অববাহিকায় জমা হতো। তারপর ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘমেয়াদী কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কেরোজেন গঠিত হতো, যা ছিল নানা ধরণের জৈব পদার্থের মিশ্রণ। এভাবে ভূগর্ভে জমে থাকা জৈব পদার্থে দীর্ঘ সময় ধরে তাপ ও চাপ বৃদ্ধি পেতে পেতে এক পর্যায়ে হাইড্রোকার্বন চেইন গঠন করে। 

সাধারণত জৈব পদার্থ গুলোর উপরে অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক স্তরগুলো জমতে থাকায় চাপ ও তাপ বাড়তে থাকে। ভূগর্ভে তাপ ও চাপ বৃদ্ধির ফলে অ্যানেরোবিক ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্ষমতা বাড়ে। ফলে ধীরে ধীরে সেই জৈব পদার্থগুলো স্বল্প পরিমাণে অন্য উপাদান গুলোর সাথে মিশে হাইড্রোকার্বনের রূপ নেয়। পরবর্তীতে, হাইড্রোকার্বনের উপাদান গুলো শিলা থেকে রূপান্তরিত হয়ে পেট্রোলিয়ামের রূপ নিয়ে মাটির নিচে জমে থাকে।

প্রাচীনকালের যেকোনো জৈব পদার্থ থেকেই তেল উৎপাদন হতে পারে। পুরনো বনভূমির জৈব উপাদানের রূপান্তর থেকেও তেল আসতে পারে। স্থলজ উদ্ভিজ পদার্থ থেকে কেরোজেন উৎপন্ন হয় এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত হাইড্রোকার্বন গ্যাস থেকে তেল জমতে থাকে। তবে তেল উৎপাদন একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া এবং বিপুল পরিমাণ জৈব পদার্থের প্রয়োজন হয়, যা শুধুমাত্র সমুদ্রে প্ল্যাঙ্কটনের বিশাল পরিমাণের কারণেই অর্জন করা সম্ভব। 

ভিন্নমতে, 

তেল কোথা থেকে আসে, এ নিয়ে- কয়েকজন বিজ্ঞানী অতীতের যুক্তি দিয়েছিল তেলের/পেট্রোলিয়াম এর একটি অজৈব উৎস ভূগর্ভে বিদ্যমান রয়েছে। তাদের মতামত অনুযায়ী, কোন প্রাণীর অবশিষ্টাংশ ছাড়াই পৃথিবীর গভীরে তেল গঠিত হতে পারে। ১৯ শতকের প্রথমদিকে, রাশিয়ার রসায়নবিদ দিমিত্রি মেন্দেলিভ এসকল উপাদানের প্রথম পর্যায়ের সারণি প্রকাশ করেছিলেন।

অজৈব তত্ত্বের মতে, পৃথিবীর উপরিস্তরের কার্বনগুলো হাইড্রোকার্বন-অনু কিংবা মিথেন রূপে ভূগর্ভে বিদ্যমান থাকতে পারে। পেট্রোলিয়ামেও প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোকার্বন পাওয়া যায়। এটি বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উৎপন্ন হয় এবং এর জন্য জৈব জীবাশ্মের প্রয়োজন হয় না। পরবর্তীতে এই হাইড্রোকার্বন গুলো পৃথিবীর ভেতর থেকে ভূত্বকের দিকে উঠে আসতে পারে এবং অথবা অভেদ্য স্তরে তেল জমে থাকতে পারে।

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক অস্ট্রিয়ান জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানী টমাস গোল্ড ১৯৯২ সালে আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের জার্নাল PNAS -এ ‘Deep Hot Biosphere’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, “হাইড্রোকার্বন জৈবিক বর্জ্য বা জীবাশ্ম জ্বালানির কোনো উপজাত নয়। এটি এমন একটি উপাদান যা প্রায় ৪৫০ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীর গঠন হওয়ার সময় থেকেই উপস্থিত ছিল”।

উপরোক্ত দুটি তত্ত্ব থেকে পেট্রোলিয়ামের উৎপত্তির জৈব তত্ত্বটি গবেষকদের মাঝে সর্বাধিক গৃহীত। কারণ তেলের গবেষণায় প্রাণী এবং উদ্ভিদের জীবাশ্মের অবশিষ্টাংশের সন্ধানও পাওয়া গেছে। তাছাড়া সমস্ত তেলের মজুদ পাওয়া গেছে পাললিক ভূখণ্ড থেকে।

ভূগর্ভে পেট্রোলিয়াম এর পরিমাণ | তেলের খনির বর্তমান অবস্থা

পৃথিবীতে প্রায় সকল প্রকার উপাদানে সীমিত এবং নির্দিষ্ট পরিমাণে রয়েছে। একইভাবে ভূগর্ভে থাকা পেট্রোলিয়াম মজুদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে কোন এক সময় এই খনিজ সম্পত্তি ফুরিয়ে যাবে। 

মেসোজোয়িক যুগ থেকে এখন পর্যন্ত ভূগর্ভে কত পেট্রোলিয়াম জমা হয়েছে, তা নিখুঁতভাবে বলা কঠিন। তবে বিভিন্ন গবেষক এবং বিজ্ঞানীদের ধারণা, ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা যাবে এমন পেট্রোলিয়ামের পরিমাণ প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ব্যারেল। এখানে, ১০০ কোটিতে এক বিলিয়ন এবং ১০০০ বিলিয়নে ১ ট্রিলিয়ন। অর্থাৎ ভূগর্ভে প্রায় ১.৫ লক্ষ কোটি ব্যারেল পেট্রোলিয়াম জমা রয়েছে।

বর্তমানে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩.৫ হাজার কোটি ব্যারেল পেট্রোলিয়াম উত্তোলন এবং ব্যবহার করা হয়। এই হারে উত্তোলন করতে থাকলে মাত্র ৫৩ বছরেই ভূগর্ভের পেট্রোলিয়াম ফুরিয়ে যেতে পারে। তবে ভূগর্ভে সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা কখনোই সুনিশ্চিত নয়। কিন্তু ৫০ বছরে না হলেও আগামী ১০০ বছরের মধ্যে এই জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরো পড়ুন: কীভাবে সীসা বিষক্রিয়া একটি প্রজন্মের ব্যক্তিত্বকে পরিবর্তন করেছে

ভবিষ্যতে এই জ্বালানির পরিমাণ ফুরিয়ে গেলে হয়তো বা নতুন কোন জ্বালানি ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হবে। কিন্তু পৃথিবীর ভূ-গর্ভের সম্পদ পরিপূর্ণভাবে শেষ হয়ে গেলে, তা মানবসভ্যতাকে বিলুপ্ত করার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

শেষকথা

তেল কোথা থেকে আসে তা এই লেখা থেকে বিস্তারিত জানতে পারলেন। পৃথিবীর খনিজ সম্পদগুলো আমাদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ভূপৃষ্ঠে এবং ভূগর্ভে নানারকম অস্বাভাবিক অবস্থা ও বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। তাই এটি অতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে, পাশাপাশি জ্বালানি শক্তি হিসেবে ব্যবহার যে নতুন কোন উদ্ভাবন করতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *